বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে ফিরোজের উদ্ভাবন

বিদ্যুৎ ছাড়া বর্তমান সময়ে কোনো কিছুই চিন্তা করা যায় না। কলকারখানা বা ঘরবাড়ি সব জায়গাতেই বিদ্যুৎ অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিষয়। কিন্তু মাঝেমধ্যে আমাদের ভুল বা গাফিলতির কারণে বিদ্যুতের অপচয় হয়। আর বিদ্যুতের অপচয় ঠেকাতে এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য সেন্সর সমৃদ্ধ এলইডি লাইট তৈরি করেছেন উদ্ভাবক মো. ফিরোজ শিকদার।

ফিরোজ দুই ধরনের বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী লাইট তৈরি করেছেন। এর মধ্যে একটি বাসাবাড়ির জন্য এবং আরেকটি রাস্তায় আলো সরবরাহের জন্য। ফিরোজ শিকদারের দাবি, তাঁর তৈরি এসব লাইট ব্যবহার করলে অনেকাংশেই বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।
এলইডি স্ট্রিট লাইট
সন্ধ্যার পরই রাস্তায় চলাচলের জন্য বাতি জ্বালানো হয়। এসব বাতি জ্বলে সারা রাত। ভোরে বন্ধ করে দেওয়া হয় এসব বাতি। উদ্ভাবক ফিরোজ শিকদার বলেন, ‘একটি টেলিভিশন চ্যানেলে টক শো দেখছিলাম। সেখান থেকে আঁতকে ওঠার মতো একটি তথ্য জানতে পারি। ঢাকা সিটি করপোরেশনের রাস্তায় যে সোডিয়াম ও টিউবলাইট রয়েছে, তা প্রতিদিন ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে জ্বালানো হয়। ফলে সকাল-বিকেল দুই সময়ে দুই ঘণ্টা করে বেশি জ্বলে রাস্তার এসব লাইট। যার জন্য প্রতিদিন সিটি করপোরেশনের বাড়তি খরচ হয়, এ ছাড়া বিদ্যুতের অপচয়ও ঘটে।’

এটা জানার পর থেকেই কীভাবে বিদ্যুতের অপচয় রোধ করা যায়, সেটা নিয়ে ভাবতে শুরু করেন ফিরোজ। তিনি বলেন, ‘১০ দিন গবেষণার পর একটি সেন্সর সুইচ উদ্ভাবন করলাম, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাস্তার বাতি জ্বালানো বা নেভানোর কাজ করবে। আর এতে লাইটপ্রতি খরচ হবে মাত্র ৪০ টাকা। ভেবেছি সোডিয়াম লাইটে খরচ বেশি, এলইডি বাতিতে তুলনামূলকভাবে বিদ্যুৎ খরচ কম, কিন্তু আলো বেশি। তাই নিজের তাগিদেরই এলইডি স্ট্রিট লাইট তৈরি করলাম।’

ফিরোজ শিকদার তাঁর তৈরি এই লাইটের নাম দিয়েছেন ‘এলইডি স্ট্রিট লাইট’। এটি কাজ করবে আলোর ওপর নির্ভর করে। সেন্সরের ওপর যদি আলো পড়ে, তাহলে বাতি নিভে যাবে। আর যদি আলো কমে আসে, তাহলে বাতিগুলো জ্বলে উঠবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। উদ্ভাবক ফিরোজ শিকদারের মতে, ‘এতে মানুষ দিয়ে লাইট সুইচিংয়ের জন্য সিটি করপোরেশনের যে বাড়তি সময়, অর্থ ও বিদ্যুৎ অপচয় হতো তা আর হবে না।’

রাস্তায় এসব এলইডি লাইট ব্যবহারের জন্য তিনটি ভিন্ন ওয়াটের লাইট তৈরি করেছেন তিনি। ৪৮, ৯৬ ও ১৯২ ওয়াটের এসব লাইট সেটের দাম আড়াই হাজার থেকে আট হাজার টাকার মধ্যে। ফিরোজ শিকদার বলেন, ‘এসব এলইডি বাতি একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী এবং প্রচুর আলো উৎপাদন করতে সক্ষম।’ তিনি আরো বলেন, ‘বাজারে অন্যান্য লাইটে সাধারণত এক বছরের গ্যারান্টি দেওয়া থাকে। তবে আমার তৈরি লাইটগুলোতে তিন থেকে পাঁচ বছরের রিপ্লেসমেন্ট গ্যারান্টি দিচ্ছি। অর্থাৎ যদি কোনো লাইট নষ্ট হয়ে যায়, তার বিনিময়ে নতুন লাইট পাবেন ব্যবহারকারীরা।’

হোম সিকিউরিটি এলইডি বাল্ব 
উদ্ভাবক মো. ফিরোজ শিকদারের আরেকটি উদ্ভাবন হোম সিকিউরিটি এলইডি বাল্ব। এই বাতিগুলো তৈরি করা হয়েছে বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য। এ বিষয়ে ফিরোজ শিকদার বলেন, ‘রাজধানী ঢাকায় নানাভাবে বিদ্যুতের অপচয় হয়। অফিস, কারখানা বা বাসাবাড়িতে অকারণেই দিনে-রাতে বাতি জ্বলতে দেখা যায়। এতে অকারণে প্রচুর বিদ্যুতের অপচয় হয়। বিদ্যুতের অপচয় ঠেকাতে আমি তৈরি করেছি সেন্সর সিস্টেম লাইট, যা কাজ করবে শুধু প্রয়োজনীয় সময়ে। বাসার সিঁড়িতে যে বাতি লাগানো থাকে, সেটি শুধু কোনো মানুষ এলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্বলে উঠবে এবং মানুষ চলে গেলে আবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিভে যাবে। ফলে সারা রাত বাতি জ্বালিয়ে রাখতে হবে না। বিদ্যুতের অপচয় রোধ হবে।’

২০১৩ সালে ‘এইচডি হোম সিকিউরিটি এলইডি বাল্ব’ তৈরি করেন ফিরোজ। পরের বছর ২০১৪ সালে তিনি তৈরি করেন এলইডি স্ট্রিট লাইট। হোম সিকিউরিটি এলইডি বাল্বটিও কাজ করে একটি সেন্সরের মাধ্যমে, যেটা বাল্বের মধ্যেই দেওয়া থাকে। মানুষ বা প্রাণীর উপস্থিতি এর নড়াচড়া দিয়ে বুঝতে পারে সেন্সরটি। উপস্থিতি টের পেলেই বাতিগুলো জ্বলে ওঠে। আবার যদি কেউ না থাকে, তাহলে সেটাও সেন্সরটি বুঝতে পারে এবং বাতি নিভিয়ে ফেলে। শুধু বাড়িতে নয়, কারখানার কাজেও ব্যবহার করা যাবে এসব এলইডি বাল্ব।

এ ছাড়া ফিরোজ যে সেন্সরটি ব্যবহার করে বাল্বটি তৈরি করেছেন, সেটাও আলাদা করে ব্যবহার করা যায়। যেকোনো সাধারণ বাল্বকেই সেন্সরটির মাধ্যমে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী বাতিতে পরিণত করা যাবে। ১২ ওয়াটের একটি হোম সিকিউরিটি এলইডি বাল্বের দাম পড়বে ২৫০ টাকা।

ফরিদপুরের ভাঙ্গায় জন্ম উদ্ভাবক ফিরোজ শিকদারের। প্রকৌশল বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা না থাকলেও নিজের আগ্রহ তাঁকে উদ্ভাবক হিসেবে তৈরি করেছে।

দেখে দেখেই কাজ শিখেছেন নিজের আগ্রহে। আর সেখান থেকেই তৈরি করেছেন নিজের পথ। এর আগে পোশাক কারখানায় কাজের জন্য বিভিন্ন যন্ত্রপাতি তৈরি করেছেন তিনি। আগে বিদেশ থেকে এসব যন্ত্র আমদানি করতে হতো, সেখানে খরচ কমানোর জন্য নিজের মেধা খাটিয়ে দেশি পদ্ধতিতে এসব যন্ত্রপাতি তৈরি করেন তিনি।

সেসব যন্ত্র বিভিন্ন পোশাক কারখানায় এখন ব্যবহার হচ্ছে। কারখানার যন্ত্রাদি কম খরচে নির্মাণের পর ফিরোজ গবেষণা শুরু করেন বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী বাতি নিয়ে। সেখানেও সফল হন তিনি। তবে বর্তমানে এই বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী বাতি নিয়ে আরো গবেষণা ও এর প্রচারের জন্য অর্থ প্রয়োজন তাঁর। তিনি মনে করেন, কোনো বিনিয়োগকারী যদি তাঁর এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করেন, তাহলে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী বাতি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা যেমন সম্ভব হবে, তেমনি দেশি প্রযুক্তিরও উন্নয়ন ঘটবে। শুধু বিদ্যুৎ সাশ্রয় নয়, কী করে দৈনন্দিন কাজ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়, সেটা নিয়েও গবেষণা অনেক দূর এগিয়ে গেছে বলে জানান এই উদ্ভাবক।

আগ্রহী বিনিয়োগকারী ও ক্রেতারা উদ্ভাবক মো. ফিরোজ শিকদারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন ০১৬১২১৬৮৭৭ এই নম্বরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *